তারারা তখনই জ্বলবে, যখন তাদের কাছে একটা ঠিকঠাক চিত্রনাট‍্য থাকবে

0
53

ঢাকা , ২১ আগস্ট , (ডেইলি টাইমস ২৪)

২০০০ সালের গোড়ার দিকে, বাংলাদেশে টেলিভিশনের বাইরে তখন দু-তিনটা টেলিভিশন চ‍্যানেল। বিভিন্ন আয়োজনের মধ্যে ‘টেলিভিশন নাটক’-এর জনপ্রিয়তা তৈরি হয়। বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হুমায়ূন আহমেদের ‘এ সপ্তাহের নাটক’ আর ‘ধারাবাহিক নাটকে’ আমাদের মধ‍্যবিত্তের মূল আগ্রহ। তার সঙ্গে ছিল আমাদের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অসাধারণ অভিনয়ক্ষমতা, যা আমাদের স্বাধীনতা-উত্তর থিয়েটার আন্দোলন আর আশির দশক ও নব্বইয়ের দশকের শুরু পর্যন্ত স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ফসল বলা যায়। আমাদের বিটিভির ‘নাটক’ মূলত ছিল সংলাপ আর অভিনয়নির্ভর। তাই নির্মাতাদের নাম কখনো জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারত না। খুব কম মানুষই বলতে পারবে কোথাও কেউ নেই বা সংশপ্তক-এর মতো অসাধারণ কাজ কে নির্মাণ করেছেন।

আশির দশকে বাংলাদেশে বিকল্পধারার চলচ্চিত্র আন্দোলনের জোয়ার আসে। আমরা সবাই বড় ভাইদের নেতৃত্বে বিশ্বের সিনেমাগুলো উপভোগ করতে শুরু করি। সেই সঙ্গে জায়গা খুঁজতে থাকি নিজেদের গল্প বলার। নির্মাতা হিসেবে নিজেদের তখন অবস্থান পাওয়ার একটা জায়গা তৈরি করে দেয় একুশে টেলিভিশন। নওয়াজীশ আলী খানের মতো অভিজ্ঞ প্রযোজকেরা আমাদের নির্মাতা হিসেবে জায়গা করে দেন। ছোট মুখে বড় কথা হবে বললে। তারপরও বলি, একধরনের ‘অতঁর’ সিনেমার মতোই স্বল্প পরিসরে আমরা হাজির হলাম আমাদের গল্প নিয়ে, আমাদের তখন সিনেমা বানানোর স্বপ্ন আর চর্চা। থিয়েটার আন্দোলেনের ফসল মেধাবী অভিনয় কলাকুশলী, মধ‍্যবিত্তের বিনোদনে আমাদের হাজিরা—এসবই হয়েছে সময়ের প্রয়োজনে। টেলিভিশনে ‘নাটক’ থেকে আমাদের বের হয়ে মূল চালিকাশক্তি ছিল আমাদের সিনেমাচিত ন‍্যারেটিভ চর্চার অভিপ্রায়।

২০০০ সালের পর বেসরকারি টেলিভিশনের বাজার বড় হতে শুরু করে। কলাকুশলীর অভাব দেখা দেয় টেলিভিশন ন্যারেটিভের অতিরিক্ত চাহিদার তুলনায়। সেই সঙ্গে আমাদের বেসরকারি টেলিভিশন চ‍্যানেলের মালিকেরা গণমানুষের বিনোদনের থেকে চ‍্যানেলগুলোকে তাঁদের রাজনৈতিক ভ‍্যানগার্ড হিসেবে ব‍্যবহার করতে শুরু করে। সেই সঙ্গে বিনোদন আর প্রোগ্রাম ডিজাইনে টেলিভিশন প্রযোজকের চেয়েও বেশি প্রয়োজন হয়ে পরে মার্কেটিংয়ের কর্মী আর ইলেকট্রনিকস সাংবাদিকদের। টেলিভিশন ন‍্যারেটিভ একসময় শুধুই বেনিয়া আর লম্পটদের হাতে চলে যায়, সেখানে আর যা-ই হোক সৃজনশীল বিনোদন সম্ভব নয়।

টেলিভিশন ন্যারেটিভ নির্মাণ থেকে তাই নিজেকে সরিয়ে রেখে আমরা সবাই নিজের রুটি-রুজি নিয়ে ব‍্যস্ত ছিলাম এবং আছি। তারপরও বছরে শুধু ঈদের সময় একটা ন‍্যারেটিভ নির্মাণের চেষ্টা করেছি, তারপর দেখা গেল ৪০ মিনিটের কনটেন্টের মধ্যে ৬০ মিনিটের বিজ্ঞাপনের কারণে সেই আগ্রহ কমে যাচ্ছে। যেকোনো খারাপ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় নিজেদেরই বের করতে হবে, তাই হয়তো গত কয়েক বছর ধরে এর একটা পরিবর্তন লক্ষ‍ করছি। আমরা প্রথম ‘আয়নাবাজি অরিজিনাল সিরিজ’ নামে একটা প্রজেক্ট শুরু করলাম, সেই সঙ্গে ‘ছবিয়াল রি-ইউনিয়ন’ সিরিজও হলো। এসব সিরিজের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, যেহেতু টেলিভিশনের প্রযোজক নেই, তাই কেউ একজন ক্রিয়েটিভ প্রডিউসার হয়ে সেই প্রজেক্টের নিজস্ব মান ঠিক করা। অর্থাৎ টেলিভিশনের মূল শক্তি হলো একটা মানসম্পন্ন চিত্রনাট‍্য বাছাই করা এবং সত‍্যিকার অর্থে পারদর্শী নির্মাতাকে দিয়ে সেটা নির্মাণ করা।

আয়নাবাজি অরিজিনাল সিরিজে আমাদের কিছু ভুলত্রুটি ছিল, কিন্তু সেটা কিছুটা উতরে আমরা নির্মাণ করি ‘অস্থির সময়ে স্বস্তির গল্প’ সিরিজ। আমার আর মেজবাউর রহমান সুমনের তত্ত্বাবধানে আমরা করি এমন একটা প্রজেক্ট, যেখানে কোনো পরিচালকই আগে টেলিভিশনের জন‍্য কাজ করেননি। এই নবীন নির্মাতারা নতুন উদ্যম আর প্রেম নিয়ে কাজগুলো করে, যা আমরা সেই গোড়ার দিকে আমাদের নির্মাতাদের করতে দেখেছি। সেই সঙ্গে কিছু কাজ যথেষ্ট প্রশংসিত হয়েছে, তার মধ‍্যে বুকের মাঝে কিছু পাথর থাকা ভালো, শ‍্যাওলা, কথা হবে তো, মাহুত আর নুহাশ হুমায়ূনের হোটেল অ্যালব্যাট্রস। এই কাজগুলো ভালো হওয়ার মূল কারণ হলো নির্মাতাকে নিজের স্বাধীনতা দিয়ে নির্মাণ করতে দেওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করা।

কয়েক বছর ধরে ঈদে টেলিভশন ফিকশন নির্মাণের যে হুজুগ পড়েছে তার মূল কারণ হলো এই সময় পৃষ্ঠপোষক (স্পনসর) পাওয়া যায় আর মিডিয়া হাউসগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো বাজেট বানিয়ে প্রোগ্রাম প‍্যাকেজ নির্মাণ করে, যা বড় বড় কোম্পানির কাছে বিক্রি করে। সেখানে গল্পের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায় কিছু চেহারা, কিছু তারা, যারা জ্বলজ্বল করে টেলিভিশনের পর্দায়, কিন্তু আমরা কি কখনো চিন্তা করি না, এই তারারা তখনই জ্বলবে, যখন তাদের কাছে একটা ঠিকঠাক চিত্রনাট‍্য থাকবে, নির্মাতা থাকবে।

বোকাবাক্সের মালিকেরা যত দিন এই সহজ সমীকরণ মেলাতে পারবেন না, তত দিন আমাদের টেলিভিশন কনটেন্টের উন্নতি হবে না। একটি ভালো টেলিভিশন ন‍্যারেটিভ প্রযোজনা-পরিচালনার পুরো প্রক্রিয়ায় ব‍্যাবসায়ীদের একটু দূরে রাখলে ভালো, এই কাজের প্রথমে প্রয়োজন সৃজনশীল বিকাশ, তারপর বিপণন। আগেই বিপণনের ভাবনা মাথায় নিয়ে নিলে কোনো ভালো কাজ সম্ভব না।

আমাদের টেলিভিশন ফিকশনাল ন‍্যারেটিভ খুব সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হয়েছে। এখন এই ফিকশনাল ন‍্যারেটিভে বিপণনের অনেক জায়গা তৈরি হয়েছে, একই সঙ্গে আমরা অনলাইন আর টেলিভিশনের মুনাফা অর্জন করতে পারি। আমাদের আছে অসম্ভব সম্ভাবনাময় অভিনয় কলাকুশলী। সেই সঙ্গে আমাদের রয়েছে বিশাল সাহিত‍্য ভান্ডার, এই ভান্ডার থেকে ভূরি ভূরি চিত্রনাট‍্য নির্মাণ করা সম্ভব। আমাদের কাজ হলো সবার আগে আমাদের চিত্রনাট‍্যকার তৈরি করা আর এই চিত্রনাট্যকার হিসেবে একজন তখনই তৈরি হবে যখন সে আত্মমর্যাদা নিয়ে চিত্রনাট‍্যকে জীবিকা হিসেবে নিতে পারবে। কম খরচে প্রযোজনা করে, কলাকুশলীদের তাদের যোগ‍্য পারিশ্রমিক না দিয়ে মুনাফা অর্জনের চেষ্টা থাকলে আমাদের পটপরিবর্তন কখনো হবে না।

অমিতাভ রেজা: নির্মাতা