করোনায় পণ্যের দাম বৃদ্ধির আইনগত প্রতিকার কী?

ঢাকা , ১০ মার্চ, (ডেইলি টাইমস২৪):

করোনাভাইরাস আসছে এই সুযোগে যেসব ব্যবসায়ী জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রতিকার নেয়া যেতে পারে- এ বিষয়ে অনেকে হয়তবা জানেন না। যেমন- ১০/১৫ টাকার মাস্ক বিক্রি হচ্ছে বা করছে ১০০ টাকায়, টিস্যু, হ্যান্ডওয়াশ এবং ন্যাপকিন জাতীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হচ্ছে বা করছে যা কঠোর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে ও আইনগত প্রতিকারের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

বাংলাদেশে কোনো গুজব এলে তা মনে হয় খুব তাড়াতাড়ি রটে যায়। আবার এক শ্রেণির অসাধু ও মুনাফালোভী ব্যবসায়ী গুজব সংশ্লিষ্ট পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। যেমন লবণের ক্রাইসিস হচ্ছে মনে করে ভোক্তা সাধারণ যখন একেক জন বেশি পরিমাণ লবণ কিনছে তখন লবণে কেজি প্রতি ৬০/৭০ টাকা বেশি নেয়া শুরু হলো। পেঁয়াজের ঝাঁঝের কথাতো আমরা সবাই জানি। এখন শুরু হয়েছে করোনাভাইরাস এবং তা মোকাবেলায় ব্যবহৃত পণ্য সামগ্রীর অত্যাধিক দাম বৃদ্ধির খবর পাওয়া যাচ্ছে। উক্ত দাম বৃদ্ধি ও মজুদদারি ঠেকাতে কী কী পদক্ষেপ নেয়া যায় এবং বিদ্যমান আইন ভোক্তা সংরক্ষণ আইন ও স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট কী বলে তা জেনে নেওয়া যাক।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ বা নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ এ ‘ভেজাল’ শব্দটিকে সংজ্ঞায়িত না করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এ বলা হয়েছে ‘ভেজাল’ অর্থ পিউর ফুড অর্ডিন্যান্স, ১৯৫৯ এর ধারা ৩ (১) এ সংজ্ঞায়িত Adulteration এবং স্পেশাল পাওয়ারস অ্যাক্ট, ১৯৭৪ এর ধারা ২৫ সি বা অন্য কোনো আইনে উল্লিখিত Adulteration বা ভেজাল।

‘ভোক্তা’ বলতে সাধারণ অর্থে আমরা যেকোনো পণ্যের ক্রেতা বা গ্রহীতাকে বুঝি। কিন্তু ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এ ভোক্তাকে সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। আইনটিতে বলা হয়েছে, ভোক্তা অর্থ এমন কোনো ব্যক্তি যিনি (ক) পূনঃবিক্রয় ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ব্যতীত- (অ) মূল্য পরিশোধে বা মূল্য পরিশোধের প্রতিশ্রুতিতে কোনো পণ্য ক্রয় করেন : (খ) যিনি ক্রেতার সম্মতিতে (ক) এ উল্লিখিত কৃত পণ্য ব্যবহার করেন; ব্যবসায়ীদের যেসব কাজ ভোক্তা অধিকারবিরোধী কাজ হিসেবে গণ্য হবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ সেসব কাজের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

আইনটিতে বলা হয়েছে,ভোক্তা অধিকারবিরোধী কার্য অর্থ –

ক. কোনো আইন বা বিধির অধীন নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা অধিক মূল্যে কোনো পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রি করা বা করতে প্রস্তাব করা; খ. জ্ঞাতসারে ভেজাল মিশ্রিত পণ্য বা ওষুধ বিক্রি করা বা করতে প্রস্তাব করা;
গ. মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিকারক কোনো দ্রব্য, কোনো খাদ্যপণ্যের সাথে যার মিশ্রণ কোনো আইন বা বিধির অধীন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, উক্ত রূপ দ্রব্য মিশ্রিত কোনো পণ্য বিক্রি করা বা করতে প্রস্তাব করা;
ঘ. কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রির উদ্দেশ্যে অসত্য বা মিথ্যা বিজ্ঞাপনে ক্রেতা সাধারণকে প্রতারিত করা;
ঙ. প্রদত্ত মূল্যের বিনিময়ে প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রি বা সরবরাহ না করা;
চ. কোনো পণ্য সরবরাহ বা বিক্রির সময় ভোক্তাকে প্রতিশ্রুত ওজন অপেক্ষা কম ওজনের পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহ করা;
ছ. কোনো বিক্রি বা সরবরাহের উদ্দেশ্যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ওজন পরিমাপের কার্যে ব্যবহৃত বাটখারা বা ওজন পরিমাপক যন্ত্র প্রকৃত ওজন অপেক্ষা অতিরিক্ত ওজন প্রদর্শনকারী হওয়া;
জ. কোনো পণ্য বিক্রি বা সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুত পরিমাপ অপেক্ষা কম পরিমাপের পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহ করা;
ঝ. কোনো পণ্য বিক্রি বা সরবরাহের উদ্দেশ্যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে দৈর্ঘ্য পরিমাপের কার্যে ব্যবহৃত পরিমাপক ফিতা বা অন্য কিছু প্রকৃত দৈর্ঘ্য অপেক্ষা অধিক দৈর্ঘ্য প্রদর্শনকারী হওয়া;
ঞ. কোনো নকল পণ্য বা ওষুধ প্রস্তুত বা উৎপাদন করা;
ট. মেয়াদোত্তীর্ণ বা ওষুধ বিক্রি করা বা করতে প্রস্তাব করা; বা
ঠ. সেবাগ্রহীতার জীবন বা নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে এমন কোনো কার্য করা, যা কোনো আইন বা বিধির অধীন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এ যেসব কার্যকলাপকে অপরাধ গণ্য করা হয়েছে তা হলো-
ক. আইন ও বিধি দ্বারা নির্ধারিত হওয়া সত্ত্বেও পণ্যে মোড়ক ব্যবহার না করা;
খ. মূল্যের তালিকা প্রদর্শন না করা;
গ. সেবার মূল্যের তালিকা সংরক্ষণ ও প্রদর্শন না করা; ধার্যকৃত মূল্যের অধিক মূল্যে পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রি করা;
ঘ. ভেজাল পণ্য বা ওষুধ বিক্রি করা;
ঙ. খাদ্যপণ্যে নিষিদ্ধ দ্রব্য মিশ্রণ করা;
চ. মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাসাধারণকে প্রতারিত করা;
ছ. প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রি বা সরবরাহ না করা;
জ. ওজনে কারচুপি করা;
ঝ. বাটখারা বা ওজন পরিমাপক যন্ত্রে প্রকৃত ওজন অপেক্ষা অতিরিক্ত ওজন প্রদর্শন করা; ঞ. পরিমাপে কারচুপি করা;
ট. দৈর্ঘ্য পরিমাপক কার্যে ব্যবহৃত পরিমাপক ফিতা বা অন্য কিছুতে কারচুপি করা;
ঠ. পণ্যের নব প্রস্তুত বা উৎপাদন করা;
ড. মেয়াদোত্তীর্ণ কোনো পণ্য বা ওষুধ বিক্রি করা;
ঢ. সেবাগ্রহীতার জীবন বা নিরাপত্তা বিপন্নকারী কার্য করা এবং
ণ. অবহেলা, দায়িত্বহীনতা বা অসতর্কতা দিয়ে সেবাগ্রহীতার অর্থ, স্বাস্থ্য বা জীবনহানি ঘটানো;

মামলা ও বিচার হবে কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর ১৮৯৮ অনুযায়ী, আইনে যা-ই থাকুক না কেন, সরকার বা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি, নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক এ আইনের অধীনে লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আইনের অধীন কোনো অপরাধ বিচারার্থে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত আমলে নিতে পারবেন।

ক্ষতিপূরণের বিষয়ে আইনে বলা হয়েছে-

জরিমানা ও শাস্তির বিধান আরো সুনির্দিষ্ট যেমন জীবননাশক বা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো রাসায়নিক বা ভারী ধাতু বা বিষাক্ত দ্রব্য মিশ্রিত কোনো খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, আমদানি, প্রস্তুত, মজুদ, বিতরণ, বিক্রয় বা বিক্রয়ের অপচেষ্টা করলে অনূর্ধ্ব সাত বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হবে। পুনরায় একই অপরাধ করলে সাত বছর থেকে অনূর্ধ্ব ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা অন্যূন ১০ লাখ টাকা জরিমানা।

এ ছাড়া দূষণ মিশ্রিত কোনো খাবার বিক্রি করলে; শর্ত ভঙ্গ করে কোনো খাদ্যদ্রব্য মজুত বা প্রস্তুত করলে; অনুমোদিত ট্রেডমার্ক বা ট্রেডনামে বাজারজাত করা কোনো খাদ্যপণ্য নকল করে বিক্রয়ের চেষ্টা করলে; খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন বা সংরক্ষণের স্থানে শিল্প-কারখানার তেল বা খনিজ বা বর্জ্য থাকার অনুমোদন দেওয়াসহ এমন ২০ ধরনের অপরাধের জন্য অনূর্ধ্ব সাত বছর থেকে কমপক্ষে দুই বছর শাস্তি এবং অনধিক ১০ লাখ টাকা অথবা কমপক্ষে তিন লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। একই অপরাধ পুনরায় করলে শাস্তি ও জরিমানার পরিমাণ আরও বাড়ানোর বিধান রাখা হয়েছে।

নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-দুটি মিলিয়ে পড়লে ওই আইনদ্বয়ে যেসব কাজ করার বিষয়ে বিধিনিষেধ অথবা যেসব কাজ অপরাধ গণ্য করা হয়েছে, তা সব নাগরিককে জানতে হবে। কেননা ওই বিধিনিষেধ ব্যত্যয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা অধিদপ্তরকে ভেজাল পণ্য বাজেয়াপ্ত ও আটকের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।

The Special Power Act 1974 এর ২৫, ২৫এ, ২৫ ডি এবং ২৭ ও ২৮ ধারার বিধান প্রয়োগ করেও অবৈধ মজুদদার ও মুনাফাখোরদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যায়। অন্যায় ও অবৈধ মজুদদারদের বিরুদ্ধে মূলত বিশেষ ক্ষমতা আইনটি করা হয়েছিল। একটু প্রয়োগ করলেই হয় অথচ এই আইনটি বেশির ভাগ ব্যবহার হয় ইন্ডিয়া হতে কে চকলেট আনলো কে রেলের টিকিট বিক্রি করলো কালোবাজারিতে তার বিরুদ্ধে যেটি এই আইনের মুখ্য বিষয় নয়।

করোনাভাইরাস যেভাবে বিশ্বব্যাপী দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে তাতে সকলেই আতঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন। এর মধ্যে যদি সামান্য মাস্ক, টিস্যু, হ্যান্ডওয়াস ও ন্যাপকিনের দাম বেড়ে যায় তাহলে সেটা মড়ার ওপর খাড়ার ঘা হবে। তাই ভেজাল পণ্য ও দাম বৃদ্ধি কার্যক্রমের সাথে সুযোগ সন্ধানী জড়িত ব্যক্তিদের আটক এবং মোবাইল কোর্ট অথবা উপযুক্ত আদালতে বিচারকার্য সম্পন্নের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। নিরাপদ খাদ্য ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিতে বর্তমান সরকার নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। কবির ভাষায় পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তুলতে হবে। জনগণ সচেতন হলে ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত আরও দৃঢ় ও মজবুত হবে।

লেখক: আইন বিশ্লেষক ও গবেষক; ইমেইল[email protected]